প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন:- ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- talashbd2024@gmail.com
বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো সংবাদ মাধ্যম ও পেশাজীবী সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন এই গুণী মানুষ, এবং তাঁর এমন করুণ পরিণতি শুধুই একটি মৃত্যু নয়। এটি সাংবাদিকতা পেশার চরম অনিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের ঘৃণ্য দলিল।
দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসছে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর চরম দুর্দশা ও লড়াইয়ের কাহিনি। ২০২৩ সালে দেশটির শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধানের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর, এভাবে তাঁকে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের শিকার হতে হয়েছিল পুলক চ্যাটার্জিকে। তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং তাঁর চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বরিশাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পুলক চ্যাটার্জি পেশাগত কারণে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর সংবাদ কভার করা ও যোগাযোগ রক্ষা করার অভিযোগে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতের অসন্তুষ্টির উইঠে আসেন। ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক চাপের মুখে দৈনিক সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরো প্রধানের পদ থেকে বাদ দেন। স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমকর্মীর অভিযোগ, ওই সময় রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব অনেক দায়িত্বশীল সাংবাদিকের পেশায় পড়ে ছিল।
স্বজনদের মতে, দায়িত্ব হারানোর পর তিনি দীর্ঘ সময় কর্মহীনতা, শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক চাপের মধ্যে ছিলেন। দায়িত্ব হারানোর পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছর পুলক চ্যাটার্জি চরম কর্মহীনতা, অর্থাভাব, মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতায় কাটিয়েছেন। দীর্ঘ ১৮ বছর সেবা দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি তাঁর প্রাপ্য আইন সংগত পাওনা পরিশোধ করেনি। দীর্ঘদিন বকেয়া আদায়ের চেষ্টা করার পরও তিনি সমকালের কাছ থেকে নিজের রক্ত পানি করা রোজগারের টাকা পাননি।
মৃত্যুর আগে পুলক চ্যাটার্জি পাঁচটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) লিখে গেছেন, যা তাঁর তীব্র যন্ত্রণার এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণার নিদর্শন। নিজের সহকর্মী সুমন চৌধুরীকে লেখা এক চিরকুটে তিনি আকুতি জানিয়েছেন, যেন দৈনিক সমকালের কাছে জমে থাকা তাঁর বকেয়া পাওনা টাকা তাঁর অসহায় পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে লেখা এই চিরকুট প্রমাণ করে কীভাবে একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পাওনা আটকে রেখে ধীরে ধীরে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এমনকি চাকরি হারানোর পরও দীর্ঘদিনের প্রিয় কর্মস্থল সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিসে তিনি প্রায়ই যেতেন এবং অফিসের চাবিও ছিল তাঁর কাছে। বহুদিনের প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর আবেগ ও অসমাপ্ত পাওনার হিসাব নিয়ে ঘোরার পরেও প্রতিষ্ঠানটির নির্দয় আচরণ তাঁকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করেছে।
এখন স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃত্বও এই চরম অন্যায়ের দায় এড়াতে পারে না। পুলক চ্যাটার্জি নিজে বরিশাল প্রেসক্লাবের মতো মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অথচ তাঁর তিন বছরের আর্থিক ও পেশাগত সংকটের সময় সহকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব ছিল। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের স্লোগান দেওয়া সংগঠনগুলো এক অভিজ্ঞ সহকর্মীকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের মুখে একাকী ফেলে রেখে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জির এই করুণ সমাপ্তি স্পষ্ট করে দেয় কিভাবে ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবে একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবন তছনছ করা হয়, এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দীর্ঘদিনের কর্মী বকেয়া না দিয়ে কীভাবে তাঁদের ফেলে দেয়। ১৮ বছরের নিষ্ঠাবান সাংবাদিকতার পুরস্কার যদি হয় চরম অভাব, পাওনা বকেয়া থাকা এবং অকাল মৃত্যু, তবে বর্তমান পরিস্থিতির দায় দৈনিক সমকাল কর্তৃপক্ষ, তৎকালীন রাজনৈতিক শক্তি এবং ব্যর্থ সাংবাদিক নেতৃত্বকে আজীবন বহন করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন