প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন:- ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- talashbd2024@gmail.com
লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীন আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছেন।
আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও লালনসম্রাজ্ঞীখ্যাত ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এবং গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর এক বছর পরও তার কণ্ঠের গান, সংগীতসাধনা ও লালনের দর্শনের প্রতি তার নিবেদন শ্রোতাদের মনে অমলিন হয়ে আছে।
ফরিদা পারভীন কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি লালনগীতি ও বাঙালির লোকজ দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক হিসেবেও কাজ করেছেন। তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান দেশ-বিদেশের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। লালনের মানবতাবাদ, জীবনবোধ ও দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে ফরিদা পারভীনের ভূমিকা ছিল অনেকটাই অনন্য।
ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ার পরিবেশে। তিনি ছোটবেলায় মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গানে তার হাতেখড়ি নেন।
১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে সংগীতজীবন শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের দিকে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনসংগীতে তালিম নিতে শুরু করেন। এরপর তিনি খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও তালিম নেন।
লালনের বাণী ও সুর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার গাওয়া লালনের গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানের টানে তিনি বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছুটে বেড়িয়েছেন।
সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান। ১৯৯৩ সালে অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রের নিন্দার কাঁটা গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা গায়িকার সম্মান অর্জন করে। এছাড়া, তিনি ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার পুরস্কারও লাভ করেন।
ফরিদা পারভীন কেবল গান গাইতেন না, বরং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে লোকসংগীত ও লালনগীতি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন। প্রায় ১৭ বছর আগে প্রখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে মিলে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে লোকগান, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি ছবি আঁকা, গিটার ও তবলা শেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী সংগীতের তালিম নিচ্ছেন। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছেন তাদের মধ্যে। ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর এক বছর পরও তার প্রতিষ্ঠিত সংগীত একাডেমিতে চলছে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি একাই পরিচালনা করছেন গাজী আবদুল হাকিম।
ফরিদা পারভীনের স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমকে উল্লেখ করেছেন যে, তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে, ফরিদা পারভীনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বাংলা লোকগান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন ফরিদা পারভীন দেখেছিলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিল বরেণ্য সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের। তাদের সম্পর্ক ছিল বড়ো বোন ও ছোটো বোনের মতো। প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করে ফেরদৌসী রহমান গণমাধ্যমকে জানান, অন্যরা অনেক সময় মুখ দিয়ে গান গাইলেও, ফরিদা পারভীনের গান শুনলে মনে হত তিনি একেবারে ভেতর থেকে গাইছেন। গানের প্রতিটি কথা ও সারমর্ম উপলব্ধি করে তিনি গান গাইতেন।
ফেরদৌসী রহমান আরও জানান, ফরিদা পারভীনের গান যেমন সহজ-সরল ও মিষ্টি ছিল, তার জীবনও ছিল তেমনই সহজ-সরল। তার মধ্যে কোনো জটিলতা দেখেননি তিনি।
ফরিদা পারভীনের সন্তানদের ইচ্ছা ছিল, মাকে কুষ্টিয়া পৌর শহরে তার মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করার। শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংগীত প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ বেতারে আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) প্রচার হবে তাকে নিয়ে এক ঘণ্টার বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে তার গান পরিবেশন করবেন নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল। বাঁশি বাজাবেন গাজী আবদুল হাকিম।
এছাড়া, আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতেও স্মরণ আয়োজন থাকবে। সেখানে একাডেমির কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা ফরিদা পারভীনের জীবন এবং সংগীতে তার অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন।
আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে ফরিদা পারভীনের গান ও জীবন নিয়ে আরও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে, বলছেন গাজী আবদুল হাকিম।
এক বছর ধরে ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে নতুন কোনো গান শোনা যায়নি। তবে, তার গাওয়া গান, শেখানো সুর, লালনের বাণী এবং সংগীতসাধনার উত্তরাধিকার এখনও বয়ে চলেছেন তার শিক্ষার্থীরা। গানে ও সাধনায় রেখে যাওয়া এই উত্তরাধিকারই বাঁচিয়ে রাখছে লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের স্মৃতি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন