প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন:- ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- talashbd2024@gmail.com
গ্যাস লাইনের লিকেজ এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে সারাদেশে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এসব ঘটনায় মৃত্যু, দগ্ধ ও ক্ষতি হলেও কেউই অবহেলাজনিত ঘটনার দায় নিচ্ছে না। গত ৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের বন্দরে একটি বাসায় গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে তিনজন দগ্ধ হয়ে মারা যায়। কিন্তু এই ঘটনায় মামলায় এগোতে রাজি হয়নি নিহতদের স্বজনরা। দেশে বিগত ২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে মোট এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০০৪ সালে ঘটেছিল ৭৪৮টি দুর্ঘটনা। স্রেফ এক বছরের ব্যবধানে দেশে ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি বাড়ার পরও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাতকরণ ও নিরাপত্তা-পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের তদারকি সংস্থাগুলোর সাড়া নেই। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনার জন্য কোনও মামলা রুজু করছে না ভুক্তভোগীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকদের অসচেতনতা ও তদারকি সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। মূলত সঠিক নিয়মে সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল না করা, মানহীন সুরক্ষার যন্ত্রাংশের ব্যবহার, সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ না করাসহ মেয়াদোত্তীর্ণ বোতল এবং চুলার পাশে সিলিন্ডার রাখার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে জনসচেতনা বৃদ্ধি করা এবং অবহেলাজনিত কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা প্রয়োজন যাতে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সংশ্লিষ্টসূত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বিগত ২০২৫ সালে ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এই অগ্নিকাণ্ডে ৮৫ জনের মৃত্যু ও ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চুলা থেকে ২ হাজার ৯০৯টি, গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৯২০টি এবং গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের ফলে ১২১টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ২০২৪ সালে সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৫৩৯টি, সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত ২৯টি, গ্যাসের সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৩৭৯টি এবং শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৬১টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে, আগুনের ঘটনায় বাস্তবিক হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে পাওয়া মৃতদেহই রেকর্ড হয়, কিন্তু দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহতদের মৃত্যুর কোনও সংখ্যা নেই।
সূত্র জানাচ্ছে, বর্তমানে দেশে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারকারী ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক রয়েছেন এবং তাদের একটি বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করছে। চাহিদা মেটাতে বাজারে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৩০ কোম্পানির অন্তত ২ কোটি সিলিন্ডার রয়েছে। গত এক বছরে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৩২৩টি এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩ লাখ ১ হাজার ১৯০টি সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশে সিলিন্ডার তৈরির জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মিত ৩৫ লাখ ৮২৯টি এলপিজি সিলিন্ডার দেশে বাজারজাত করলেও সেগুলোর মান পরীক্ষার জন্য কোনও অনুমোদিত পরীক্ষণকেন্দ্র নেই। তাছাড়া অনেক অসাধু ব্যবসায়ী, বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস স্থানান্তর করেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে সহায়ক।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দেশের আগুনে পোড়া অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসা ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে হয়ে থাকে। সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস লিকেজ সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় গতবছর ওই বার্ন ইনস্টিটিউটে যথাক্রমে ১৬২ ও ৮৩ জন ভর্তি হয়েছেন। তাছাড়া দগ্ধ কয়েকজনকে মৃতাবস্থায় এখানে আনা হয়েছিল। তবে ভর্তি রোগীদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, তা জানা নেই। চিকিৎসকদের মতে, গ্যাসের আগুনে দগ্ধ রোগীদের সমস্যা সাধারণত বাড়ে। শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং গ্যাস বা ধোঁয়ায় শ্বাসনালি পুড়িয়ে ফেলার কারণে শারীরিক ট্রমার মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। বেশিরভাগ দগ্ধদের ভাষ্য হলো, ঘরে গ্যাস লিকেজ টের পাওয়া যায়নি এবং চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এদিকে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মেহেদী খান জানান, অনেক অসাধু ব্যবসায়ী গভীর রাতে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারেতে অবৈধভাবে গ্যাস স্থানান্তর করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ছিল না কোনও বৈধ লাইসেন্স। দেশের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের তদারকি করার জন্য সারা দেশে মাত্র ১৪ কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে জেলাপর্যায়ে সংস্থার কোনও অফিস খোলা হয়নি। ফলে শুধুমাত্র বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটালে গুরুত্ব বুঝে পরিদর্শন করা হয় এবং লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলা পাওয়া গেলে তাদের অনুমোদন বাতিল করা হচ্ছে। অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, লাইনের গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণ উভয় কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজেল, ভালভের কারণে লিকেজ ঘটে। নানা কারণেই ঘরে জমে থাকা গ্যাসের গন্ধ তেমন টের পাওয়া যায় না। ফলে আগুন জ্বালানোর সময় বিপদ ঘটে। এই বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ তৈরি করে। সিলিন্ডারের হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার দায়ভার রয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন