প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন:- ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- talashbd2024@gmail.com
পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে যে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং তদবির ভালো, সেই ব্যক্তিরা পদোন্নতি পাচ্ছেন। অথচ যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক পুলিশ কর্মকর্তার পদোন্নতি হচ্ছে না। বরং একজনকে ডিঙ্গিয়ে অনায়াসে আরেকজন উচ্চপদে চলে যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, এক ব্যাচ রেখে পরের ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান করা হচ্ছে। এর ফলে, অনেক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকে জুনিয়রের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে। মূলত, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত পদোন্নতি হয়ে থাকে। আর ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত পদোন্নতি গ্রহণ করা হয় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্থাৎ কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদোন্নতি পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে হয়। এসব পদোন্নতি কমিটির প্রধান হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং পুলিশের আইজিপি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বর্তমানে সরকারও বিগত সরকারগুলোর মতো দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যা পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ক্ষোভ ব্রিজায়িত করছে। পুলিশ বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসির মেধাক্রম, কর্মদক্ষতা, আচরণ, বিভাগীয় মামলা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়। তার বাইরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়। বর্তমানে দেশের পুলিশ ক্যাডারে, এএসপি হিসাবে ১ হাজার ২২২টি, অতিরিক্ত এসপি ১ হাজার ১টি, এসপি ৫৯৩টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ২৪৬টি, ডিআইজি ১১৮টি ও অতিরিক্ত আইজিপি ২২টি মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি গ্রেড-১-এ ২ জন, অতিরিক্ত আইজিপি ২১ জন, ডিআইজি ৭৮ জন, সুপারনিউমারারি ডিআইজি ২ জন, অতিরিক্ত ডিআইজি ১৬৩ জন, অতিরিক্ত ডিআইজি (চলতি দায়িত্ব) ১০ জন, সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি ১০৩ জন, এসপি ৪৬২ জন, সুপারনিউমারারি এসপি ৯২ জন, অতিরিক্ত এসপি ৮৭১ জন, এএসপি ৫৫৬ জন, শিক্ষানবিশ এএসপি ২৯০ জন, ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) ৪ হাজার ৭২৯ জন, ইন্সপেক্টর (টিটি) ৯৮৪ জন, ইন্সপেক্টর (সশস্ত্র) ৮৩৬ জন, এসআই (নিরস্ত্র) ১৯ হাজার ২০৪ জন, সার্জেন্ট (শিক্ষানবিশ) ৮৫ জন, সার্জেন্ট ২ হাজার ২৫ জন, টিএসআই ৪৪৬ জন, এসআই (সশস্ত্র) ২০ হাজার ৬৩৮ জন, এটিএসআই ২ হাজার জন, এএসআই (সশস্ত্র) ৬ হাজার ৮৫৭ জন, নায়েক ৭ হাজার ২০ জন এবং কনস্টেবল ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ জন সদস্য পুলিশ বাহিনীতে রয়েছে।
সূত্র জানাচ্ছে যে, পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে একজনকে ডিঙ্গিয়ে অন্যজনকে পদোন্নতি দেয়া এবং তদবিরের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে দেখা গেছে যে, অন্যদের ডিঙ্গিয়ে বিসিএস ৭ম ব্যাচের ৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে দুজন অতিরিক্ত আইজিপি হন, অথচ ওই ব্যাচের অন্য দুই কর্মকর্তা অবসরে যান ডিআইজি থেকেই। ৮ম ব্যাচেও একই অবস্থা ছিল। ওই ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা অবসরে এসপি পদে ছিলেন। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অবসরে গেছেন। এমনকি পিএসসির মেধাতালিকায় যে কর্মকর্তার নাম এক নম্বরে ছিল, তারও পদোন্নতি হয়নি। এছাড়া পুলিশ বাহিনীর ১২তম ব্যাচের ক্ষেত্রেও একই দশা ছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই ব্যাচের অনেকের পদোন্নতি হয়েছে। তবে পদোন্নতি বঞ্চিতদের মতে, রাজনৈতিক তদবির ও অন্যান্য কারণে তাদের পদোন্নতি প্রাপ্তিতে সমস্যা হচ্ছে। তাদের চাকরির মেয়াদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংক্ষিপ্ত করে বললে, এখনো ১৫তম ব্যাচের ১৫ জন পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। একইভাবে ১৭ ব্যাচেও একই ঘটনা ঘটেছে। যদিও ১৭ ব্যাচে ৪৯ জন থাকলেও তাদের পিএসসির তালিকা অনুযায়ী পদোন্নতি হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ১৮তম ব্যাচের ৫৫ জন কর্মকর্তার অনেকেই এখনো পদোন্নতি পাননি। পাশাপাশি, ২০তম ব্যাচে ১০৬ জন, ২১তম ব্যাচের ৪৯ জন, ২২তম ব্যাচের ৪২ জন, ২৪তম ব্যাচের ২০১ জন, ২৫তম ব্যাচের ১৯২ জন, ২৭তম ব্যাচের ১৩৭ জন, ২৮তম ব্যাচের ১৮০ জন, ২৯তম ব্যাচের ৩৫ জন, ৩০তম ব্যাচের ১৮৪ জন, ৩১তম ব্যাচের ১৮৩ জন, ৩৩তম ব্যাচের ১৫৫ জন, ৩৪তম ব্যাচের ১৪৭ জন, ৩৫তম ব্যাচের ১১৪ জন, ৩৬তম ব্যাচের ১১৩ জন, ৩৭তম ব্যাচের ৯৭ জন এবং ৩৮তম ব্যাচে ৯৭ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। পদোন্নতির ধারাবাহিকতা না থাকায় বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যদের মধ্যে সিনিয়রদের প্রতি শ্রদ্ধা কমে আসছে। বর্তমানে অনেক পুলিশ কর্মকর্তারা স্যার সম্বোধন ছাড়াই কাজ করছেন।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি সরকারী আমলেই তদবিরের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়া হয়। বর্তমান সময়ে এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। বরং পূর্বের মতো নিয়মের বাইরে গিয়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে এখনও পিএসসির মেধাক্রম অনুসরণ করা হচ্ছে। যদিও উক্ত তালিকার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া উচিত। কিন্তু প্রতিটি ব্যাচে একইভাবে পদোন্নতি প্রদান করা হচ্ছে। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন অভিযোগের সম্মুখীন। বর্তমানে পদোন্নতি নিয়ে সুপারনিউমারারি এসপি সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের উদ্বেগ, জুনিয়রদের আগে পদায়ন করা হলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বজায় থাকবে না।
অন্যদিকে, বিগত ২০২২ সালে ২৮তম ব্যাচের ২৫ জন কর্মকর্তা এসপি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে একই ব্যাচের আরও ১০৩ জনসহ অন্যান্য ব্যাচের ১৫০ জন কর্মকর্তাকে সুপারনিউমারারি এসপি পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদের বিপরীতে ৮০ জন কর্মকর্তার নিয়মিত পদায়ন হলেও এখনো ওই ব্যাচের ৬০ জন কর্মকর্তা একই পদে রয়েছেন। তারা নিয়মিত পদায়নের চোখে দিন গুনছেন। এসপিদের পাশাপাশি, অতিরিক্ত ডিআইজিদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্তিতি বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর ৩০তম ব্যাচের পদোন্নতির জন্য প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তবে সেই প্রস্তাবের সেক্ষেত্রে, শূন্য পদের জন্য ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের সুপারনিউমারারিদের আগে সমন্বয় জরুরী। এরপর পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। এইভাবে সিনিয়রিটির দিকে নজর দিলে আগে ২৮ ও ২৯-এর পরে ৩০তম ব্যাচ আসবে। আর শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি প্রদান করা উচিত। তাহলেই বাহিনীতে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সক্ষম হব। তবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুনর্গঠনের উদ্যোগ ব্যাহত হয়। বর্তমান সরকারের সময়েও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে কাজের মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়ে ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে। এমনকি প্রকৃত মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতার অভাবের কারণে নতুন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। আর এই কারণেই পুলিশ বাহিনী উন্নতি করতে পারছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে সুবিধাবাদী কিছু গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের ইচ্ছানুযায়ী অপরাধীদের অসামান্য পদোন্নতি ঘটানো হচ্ছে এবং যোগ্যরা বাদ পড়ছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন