০২:৪৬ পি.এম
বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলে শীত শুরু হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি। এই অতিথি পাখিগুলোর পাশাপাশি অনেক প্রজাতির আবাসিক পাখিও নির্বিচারে শিকার হচ্ছে। পেশাদার এবং শৌখিন উভয় শিকারিরা প্রকাশ্যে পাখি ধরছে।
প্রতিবছর শীতের মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান দেশের অতিথি পাখিগুলো আসে, যেমন বালিহাঁস, চখাচখি, ল্যাঞ্জা, ইটালি, সরালিসহ আরো অনেক। চলনবিলের জলাশয়ে নিরাপদ আবাস ও খাদ্যের খোঁজে এগুলো ছুটে আসে। এবারও শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে। চলনবিলের জলাভূমি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দীঘি সগুনা গ্রামের বাসিন্দা জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘বিলে অতিথি পাখি আসার শুরুতেই কিছু সৌখিন ও পেশাদার শিকারি কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন ফাঁদ পেতে অবাধে অতিথি পাখি শিকার করছে।’
আরও পড়ুন: দুর্যোগে সবসময় প্রস্তুতি থাকা উচিত : দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী
গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) পাখি শিকারের অভিযোগে স্থানীয় একটি পরিবেশবাদী সংস্থা চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে নাটোরের বিভিন্ন গ্রামে অভিযানে যায়। সেই অভিযানে চারজন শিকারিকে আটক করা হয়। তাদের কাছে পাখি ধরার পাঁচ হাজার ফুট কারেন্ট জাল ও দুটি ফাঁদ উদ্ধার করা হয়।
আটকদের মধ্যে দুইজনকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দুই মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যদিকে, দুইজনকে পাখি মারার শর্তে মুচলেকায় ছেড়ে দেয়া হয়। তারা শিকার করা ১০৫টি পাখি চলনবিলে অবমুক্ত করেছিল। তবে এরপরও পাখি শিকার থেমে নেই। প্রকাশ্যে বিক্রির জন্য পাখি শিকার করলেও প্রশাসনের কার্যত নজরদারি নেই।
আজ বুধবার (২৬ নভেম্বর) তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে শিকারিরা প্রকাশ্যে পাখি বিক্রি করতে দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের ভয় পেয়ে বেশিরভাগ শিকারি ক্রেতাদের সঙ্গে আগে থেকেই দাম নিয়ে নেয়। শিকারের পর, তারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রেতাদের নির্দিষ্ট স্থানে এসে পাখি দেয়। ফলে এ অঞ্চলে একটি পাখির চোরাবাজারও সৃষ্টি হয়েছে। তবে, সচেতন কিছু মানুষ পাখির আশ্রয়স্থল তৈরির পাশেপাশে, যাতে কেউ পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে নজর রাখছেন। তাড়াশ উপজেলার উলিপুর ও নওগাঁর মথুরা দীঘি তার উদাহরণ।
উলিপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমরা গ্রামের লোকেরা একত্রে পাখিদের নিরাপত্তা দিই। এ কারণে, গ্রামে শত শত পাখির নিরাপদ আবাসস্থল থাকলেও কেউ তাদের শিকার করার সাহস পায় না।’
আরও পড়ুন: শক্তিশালী আবাহনীকে রহমতগঞ্জে হারানোর চেষ্টা ব্যর্থ
নওগাঁ মথুরা দীঘিতে এ বছর অনেক বালিহাঁস আশ্রয় নিয়ে আছে। প্রতিবছর পাশের মরা করতোয়ায় এরা আশ্রয় নেয়, কিন্তু গতবছর নদী খনন করার ফলে তারা মথুরা দীঘিতে চলে এসেছে। সেখানে পাখির ডাক এখন দিনভর শোনা যায়।
ভিলেজ ভিশনের নির্বাহী পরিচালক মো. শরীফ খন্দকার জানান, পাখির শিকারি, ক্রেতা এবং স্থানীয় মানুষ একই সঙ্গে অসচেতন এবং চালাক। তারা নিজেরাও জানে, তবে পাখি শিকার কন্টিনিউ করছে। তিনি বলেন, তারা দিনরাত যে কোনো সময় পাখি শিকার করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। সৌখিন শিকারীরা স্থানীয় পাখিও নির্বিচারে শিকার করে থাকে। এজন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি ভাবে অতিথি পাখি শিকার নিষিদ্ধ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে শিকারিরা ইচ্ছেমতো শিকার করছে, এমন মন্তব্য করেছেন ভিলেজ ভিশনের নির্বাহী পরিচালক।
তাড়াশ উপজেলা বন কর্মকর্তা কামরুজ্জামান জানান, বেশিরভাগ শিকারি রাতের বেলায় পাখি শিকার করে। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৫ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, গ্যাস লাইন জব্দ
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, ‘আমরা শিকারিদের অবস্থান জানলে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করব।’
এ সম্পর্কে তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউর রহমান জানান, ‘আমরা দ্রুত চলনবিলের হাটবাজারে যৌথ অভিযান চালিয়ে পাখী শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন